কাঁকড়া ধরার কেরামতি

কাঁকড়া ধরার কেরামতি
কৈশরের কলরোলে মুখরিত আনন্দ্দ মুহূর্তের
স্মৃতিমেদুর পাতা থেকে কাঁকড়া ধরার কেরামতি
একটি ছোট ঘটনা আজ লিখলাম। পূর্ণিমা বা অমাবস্যার ভরা কোটালে আমরা কাঁকড়া ধরতে যেতাম নদীতে।কাঁকড়া ধরতে যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যেবেলা কয়েকজন মিলে দু'চারটে বাঁশের লাঠি ও দুই বা তিন ব্যাটারি যুক্ত টর্চ নিয়ে দল বেঁধে বেরিয়ে পড়তাম ব্যাঙ ধরতে।গ্রামের আনাচ-কানাচ, কলাবাগান, পুকুর পাড়,কেউ কেউ যেতাম মুসলিম পাড়ার দিকে। ছটা সাতটা নাগাদ বেরিয়ে আটটা নাগাদ ফিরে আসতাম প্লাস্টিক ভরে সোনা, কুনো ব্যাং ধরে। বাড়ি ফিরে ওই ব্যাং সব ভাগ করে নিতাম সুদ হিসেব করে। সুত হলো কাঁকড়া ধরার ছিপ।এই সুত খেজুরের ডাল, জঙ্গলের গরান গেঁওয়া গাছের ডাল কেটে হাত দুই মত লম্বা রেখে তার মাথায় পাটের দড়ি বেঁধে তার নিচে কলসি ভাঙা, বা মালশা ভাঙা, লোহা বা ইঁটের টুকরো বেঁধে ওই ভাঙা টুকরো গায়ে ব্যাং বা ইঁদুরের কাটা ছোট্ট মাংসপিণ্ড বেঁধে তৈরি করা হয়।আমাদের গ্রাম থেকে নদী একটু দূরে থাকায় খুব ভোরে উঠে পান্তাটান্তা কিছু মুখে দিয়ে ব্যাঙ বা ইঁদুর কেটে চার তৈরি করা হতো। আমাদের এক একজনের কাছে পাঁচথেকে ছটা বা তার অধিক সুত থাকতো। সেই হিসেবে চার তৈরি করে কাঁকড়া ধরার জন্য একটি ছোট্ট জাল ছেগুন জাল একটি ঢাকনা সমেত হাঁড়ি আর সুতগুলোকে আগাগোড়া বেঁধে হাতে ঝুলিয়ে ছোট্ট বৃত্তাকার ডাঙওয়ালা ছেগুন জালের মধ্যে বসিয়ে জালের ডাঙটা মাথার সামনে আটকে নিয়ে আমরা মাঠের আল সব্জি ক্ষেত ভেঙে যেতাম কাঁকড়া ধরতে।মৃদুমন্দ দখিনা ভোরের বাতাস গায়ে মাখতে মাখতে দু'চার কথার কনকাঞ্জলিতে খুব দ্রুত আমরা পা চালাতাম নদী অভিমুখে। সূর্য ওঠার আগে বা পরে পৌঁছাতাম। তখন হয়তো সবেমাত্র ভাটার শেষ জোয়ারের শুরু। নদীর একদম নিচে জল ছোট্ট স্রোতের মতো এঁকেবেঁকে চলেছে কোন অজানার উদ্দেশ্যে। হয়তো বা জোয়ারের জোশ সবে শুরু হচ্ছে মাত্র। জঙ্গলের আগে এক একজনের বিঘেকে বিঘের উপর ফিসারি । সেই ফিসারির বাঁধ ধরে আমরা ঘন জঙ্গলের মধ্যে পথ ধরে মাঝ নদীতে নেমে যেতাম।নদীতে জল অনেক নিচে থাকলে আমাদের কেউ কেউ বড় বড় ফিসারি গুলোতে সুত ফেলে নদী বাঁধে বসে থাকতাম। নদীর বালির চরে নাম লিখতাম। বালি দিয়ে মন্দির গড়তাম ।জোয়ারের ঢেউ এসে মিলিয়ে দিতে সব। নদীর লোনা জলে ছুটতাম। একে অন্যকে ধরাধরি খেলতাম। জলকেলি করতাম ।জঙ্গলের জংলি গাছে কখনওবা চড়ে বসতাম। পনেরো-বিশ মিনিট পর সুত গুলোর সুতোতে যদি দেখতাম প্রচণ্ড টান।
ছিপ বেঁকে ধনুক হওয়ার উপক্রম।ঠিক তখনই ডানহাতে ছেগুন জালটা নিয়ে বাঁ হাত দিয়ে সুতের সূতো টানতে টানতে ধীরে ধীরে জল থেকে ডাঙ্গা এক বিঘত বাকি থাকতে জাল  গলিয়ে সামুদ্রিক কাঁকড়া পাকড়াও করে সুত থেকে  তাকে আবার নদীতে ছুঁড়ে ফেলে হাঁড়িতে কাঁকড়া গুলোকে রাখতাম। এমনিভাবে কাঁকড়া ধরার নেশায় বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। সূর্য পশ্চিমে ঢুলবো ঢুলবো করছে। পেটে তখন হাজার ছুঁচোর ক্ষুধার্ত চিৎকার, শরীর অবসন্ন, ক্লান্ত। এবার যে বাড়ি ফেরার পালা। ততক্ষণে জোয়ারের জল ফুলে-ফেঁপে পূর্ণতায় প্রকাশ পেতে চলেছে। আমরা তখন এক হাঁটু এক কোমর তারপর এক বুক জলে সুত ফেলতে ফেলতে ফিশারি বাঁধে এসে উঠেছি। সবাই সবার কাকড়া দেখছি। কে কতটা কাঁকড়া পেয়েছি। কারো এক হাঁড়ি কারো হাফ হাঁড়ি ছোট বড় মাঝারি কাঁকড়া তে ঠাসা। কেউ কেউ আগামীকাল আসবো বলছে।সুত- জাল-হাঁড়ি ঠিকঠাক গুছিয়ে ক্ষুধা ক্লান্তি বিধ্বস্ত শরীর ও খুশি মন নিয়ে মেঠো পথ ধরে দু-চার কথা কীর্তনে বাড়ি ফেরা।
---- মৃত্যুঞ্জয় হালদার




Comments

Popular Posts